প্রাচীন বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া আবিষ্কার যা আজও আমরা পুনরুদ্ধার করতে পারিনি

1
157

আজ মানব সভ্যতা দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে, আজকের আধুনিক যুগে প্রতিনিয়ত কিছু না কিছু নতুন জিনিসের আবিষ্কার হচ্ছে যা আমাদের সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে।  এই অবস্থায় যখন আমরা পিছন ফিরে ইতিহাসের দিকে তাকাই তখন আমাদের সামনে একটি ছবি ফুটে ওঠে, যেখানে মানুষেরা প্রযুক্তির অভাবে অতি সাধারণ এবং কঠিন জীবন যাপন করছে। যে সমস্ত উন্নত প্রযুক্তি আজ আমরা ব্যাবহার করছি তা সম্প্রতি কিছু দশকের মধ্যেই আমরা অর্জন করছি। এর আগে মানব জাতি বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির দিক থেকে অনেক পিছিয়ে ছিল। কিন্তু আমাদের এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল কারণ প্রাচীনকালেও মানুষ এমন কিছু খোজ এবং আবিষ্কার করেছিল যা আজকের যুগের উন্নত প্রযুক্তি দাঁড়াও সেইটির পুনরাবৃত্তি আমরা করতে পারবো না। আজকের এই ভিডিওতে আমি আপনাদের এরকমই পাঁচটি প্রাচীন আবিষ্কারের ব্যাপারে বলবো যা সময়ের অন্তরালে হারিয়ে গেছে এবং বর্তমানে আমাদের কাছে উন্নত প্রযুক্তি থাকা সত্বেও সেগুলির পুনরাবৃত্তি বা পুনর্নির্মাণ করতে পারব না। তো চলুন শুরু করা যাক।

১. এক নম্বরে আছে গ্রিক ফায়ার \ Greek Fire ঃ-

rohoshyosondhane
rohoshyosondhane

৭ থেকে ১২ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য যা বাইজান্টিন সাম্রাজ্য নামে পরিচিত ছিল, তারা এক রহস্যময় হাতিয়ার ব্যবহার করত। যুদ্ধের সময় বাইজান্টিন সাম্রাজ্যের সৈন্যরা তাদের শত্রুদের উপর এমন এক রহস্যময় তরল ছড়িয়ে দিত যাতে ছিল লেলিহমান আগুনের শিখা, যা গ্রিক ফায়ার নামে আমাদের কাছে পরিচিত। এই হাতিয়ারের বিশেষত্ব হল এর আগুন জলের ওপরে ও জ্বলত। এই আগুনকে একমাত্র মাটি বা বালি চাপা দিয়েই নেভানো সম্ভব ছিল। এই তরলটি তৈরি করার প্রক্রিয়া শুধুমাত্র কিছু বিশেষ ব্যক্তিরাই জানতো আর বাইজান্টিন সাম্রাজ্যের মানুষেরা এই প্রক্রিয়াটিকে সকলের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখেছিল। আজ এই তরলটি বানানোর প্রক্রিয়া সময়ের সাথে সাথে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, অবশ্য কিছু বিজ্ঞানীরা গ্রিক ফায়ারকে পুনরায় নির্মাণ করার চেষ্টা করেছিল কিন্তু তারা সকলেই তাদের সেই চেষ্টায় বিফল হয়েছে।

২. দুই নম্বরে আছে ভিটরুম ফেক্সাইল \ Vitrum Flexile ঃ-

rohoshyosondhane
rohoshyosondhane

কাঁচের দুটি বিশেষ গুণ আছে, এক এটি স্বচ্ছ হয় আর দুই এটি খুব সহজেই ভেঙে যায়। সম্প্রতি উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে আজ এমন কাঁচ বানানো সম্ভব হয়েছে যা সহজে ভাঙে যায় না আর এই সমস্ত কাঁচ গুলি মোবাইল এবং অন্যান্য জিনিসে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু আজও আমরা এমন কাঁচ বানাতে পারেনি যা কখনোই ভাঙা সম্ভব নয়। তবে ইতিহাস বলছে কয়েক হাজার বছর আগে মানুষ সেই জ্ঞান অর্জন করে ফেলেছিল, যা দিয়ে এমন কাঁচ বানানো সম্ভব যা কখনই ভাঙবে না। রোমান ইতিহাসে তিনবার এমনই একটি পদার্থের কথা উল্লেখ করা হয়েছে যা ভিটরুম ফেক্সাইল নামে আমাদের কাছে পরিচিত। ১৪ থেকে ১৭ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে সম্রাট টিবিরিয়াসের শাসনকালে এক অজ্ঞাত ব্যক্তি তার দরবারে একটি কাঁচের ঘড়া নিয়ে আসে। এই ব্যাক্তি দাবি করে যে তাঁর এই কাঁচের ঘড়া কেউ ভাঙতে পারবে না, তার কথার সত্যতা যাচাই করার জন্য এই ঘড়াটিকে মাটিতে আছাড় মেরে দেখা হয়। কিন্তু অবাক করার বিষয়টি হল মাটিতে আঘাত করার পর সেই ঘড়া একটুও ভাঙে না, সেটি শুধুমাত্র সামান্য একটু তুবরে যায়, আর সেই ব্যক্তিটি তুবরানো জায়গায় হাতুড়ি মেরে আবার ঘড়াটিকে পুনরায় ঠিক করে দেয়। আর এই দৃশ্য দেখে সম্রাট টিবিরিয়াস অবাক হয়ে যান এবং তিনি সেই ব্যক্তি কে প্রশ্ন করেন যে এই কাঁচ প্রস্তুত করার প্রক্রিয়াটি সে ছাড়া আর কে কে জানে? আর এই প্রশ্নের উত্তরে সেই ব্যাক্তিটি জবাব দেয় যে সেই একমাত্র ব্যাক্তি যে এই কাঁচ প্রস্তুত করার পদ্ধতিটি জানে। আর এই কথা শোনামাত্র সম্রাট তার সৈন্যদের আদেশ দেন এই অজ্ঞাত ব্যক্তির শিরচ্ছেদ করার জন্য। সম্রাট টিবিরিয়াসের এই ধরনের আদেশ দেওয়ার পেছনে প্রধান কারণটি হলো, তিনি ভয়ভীত ছিলেন যে এই ধরনের জিনিস সোনা এবং রুপোর মূল্য কমিয়ে দেবে। আর সেই অজ্ঞাত ব্যক্তির মৃত্যুর সাথেই এই অদ্ভুত কাঁচ প্রস্তুত করার প্রযুক্তিটিও বিলুপ্ত হয়ে যায়।

৩. তিন নাম্বারে আছে রোমান কংক্রিট / Roman Concrete ঃ-

Vitrum Flexile
Vitrum Flexile

প্রাচীন রোমান সম্রাটেরা এমন কিছু আশ্চর্য স্থাপত্য বানিয়েছিল যা হাজার হাজার বছর ধরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে এবং নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ দিচ্ছে। এই সমস্ত শক্তিশালী স্থাপত্যের প্রধান উপকরণ ছিল কংক্রিট, এই কংক্রিট আজকের যুগের কংক্রিটের থেকে একদমই আলাদা ছিল। যেখানে আজকালকার কংক্রিটের আয়ু মাত্র ৬০ থেকে ৭০ বছর সেইখানেই রোমান কংক্রিটের আয়ু কয়েক হাজার বছর, আর এই কারণেই এই সমস্ত প্রাচীন স্থাপত্য গুলি আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে। মনে করা হয় রোমন কংক্রিটের একটি বিশেষ উপকরণ ছিল আগ্নেয়গিরির ছাই যা স্থাপত্যের গায়ে চিড় ধরতে দিত না। কিন্তু আজ সময়ের বিবর্তনের সাথে এই প্রযুক্তিও বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

৪. চার নাম্বারে আছে মিথরিডেটিয়াম / Mithridatium ঃ-

rohoshyosondhane
rohoshyosondhane

আজ যখন কোন সাপে কামড়ানো ব্যক্তির চিকিৎসা করা হয় তখন সবার আগে জানার চেষ্টা করা হয় যে সেই মানুষটি কোন বিষ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। আর এই পরীক্ষাটি করতে বেশ কিছুটা সময় লাগে আর এই সময়ের মধ্যে বিষক্রিয়ায় ঘটে সেই ব্যক্তির মৃত্যু হতে পারে। যদি এমন হতো যে সব বিষের জন্যই একটি মাত্র বিষ প্রতিরোধক ওষুধ থাকতো, তাহলে হয়ত অনেক মানুষের জীবন বেঁচে যেত। মনে করা হয়  ১২০ থেকে ৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পান্টুসের রাজা মিথ্র ডেস এমন একটি ঔষধ আবিষ্কার করেছিলেন যা সমস্ত বিষের প্রতিষেধক হিসাবে কাজ করত। রাজার সহকারি চিকিৎসকেরা এই ঔষধটিকে পরবর্তীতে আরও উন্নত করেছিল কিন্তু কালের বিবর্তনে সাথে সাথে এই প্রযুক্তিটি ও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পরবর্তীতে এই ঔষধটিকে বানানোর চেষ্টা অনেক বৈজ্ঞানিকেরাই করেছিলেন কিন্তু তারা সকলেই তাদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

৫. পাঁচ নম্বরে রয়েছে রাস্ট প্রুফ আয়রন / Rust Proof Iron ঃ-

rohoshyosondhane
rohoshyosondhane

দিল্লির কুতুব কমপ্লেক্সে একটি লোহার স্তম্ভ রয়েছে যা ভারতের প্রাচীন ধাতু বিজ্ঞানের একটি আশ্চর্য নিদর্শন। গুপ্ত সাম্রাজ্যের সময়ে নির্মিত এই লৌহ স্তম্ভটি দিল্লিতে আনার আগে উদয়গিরিতে স্থাপিত করা হয়েছিল। মনে করা হয় এই স্তম্ভটিকে ১৫০০ বছর বা তারও বেশি পুরনো। হাজার বছর ধরে প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং জলবায়ুর মার সহ্য করেও এই স্তম্ভটিতে একটুও জং পড়েনি। স্তম্ভটির উচ্চতা ২৪ ফুট এবং একটি ৯৯ দশমিক ৭২ শতাংশ লোহা দ্বারা তৈরি, আর এর ওপরে অক্সাইডের পাতলা একটি আস্তরণ রয়েছে যা এটিকে জং লাগার হাত থেকে রক্ষা করে। এইটি প্রাচীন ভারতের আধুনিক বিজ্ঞানের একটি অদ্ভুত নমুনা যা সময়ের সাথে সাথে বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং এই প্রযুক্তির পুনরুদ্ধার আজও আমরা করতে পারিনি। কারণ আমরা আজও এমন লোহা নির্মাণ করতে সক্ষম নয় যা পুরোপুরি জং রোধক।

৬. ছয় নম্বরে রয়েছে আর্কিমিডিস রে ওয়পেন / Archimedes Ray Weapon ঃ-

rohoshyosondhane
rohoshyosondhane

২১২ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে গ্রিকের গণিতজ্ঞ আর্কিমিডিস এমন একটি অস্ত্র বানিয়ে ছিল যা সূর্যের আলোকে প্রতিবিম্বিত করে শত্রুদের জাহাজকে জ্বালিয়ে দিতে পারত। এই হাতিয়ারে বড় বড় আয়নার ব্যবহার করা হতো কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই অস্ত্রটিও বিলুপ্ত হয়ে যায়। অনেকে মনে করেন যে এই ধরনের হাতিয়ার বানানো কখনোই সম্ভব নয় কারণ এই হাতিয়ারের সাহায্যে কোন নৌকা বা জাহাজকে জ্বালাতে গেলে অনেক সময় লেগবে আর এর জন্য অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশেও দরকার। এই কারনে তারা মনে করে যে এই ধরনের হাতিয়ার বানানো সম্ভব নয় বা এটি শুধুমাত্র একটি কাল্পনিক ধরোনা। কিন্তু ২০০৫ সালে এমআইটির একজন ছাত্র একটি পরীক্ষা চালিয়েছিল যাতে সে একটি বিশাল আয়না ব্যবহার করে একটি ছোট নৌকায় আগুন ধরাতে সক্ষম হয়েছিল।

আজ এই পর্যন্তই , ভালো লাগলে লাইক ও শেয়ার করবেন

ধন্যবাদ

সুমন্ত …………

rohoshyosondhane
rohoshyosondhane

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here