সৌরজগতের সবচেয়ে রহস্যময় উপগ্রহ টাইটানের কিছু অজানা তথ্য || টাইটান

1
426

গ্রীক মাইথলজিতে বলা হয়েছে টাইটান হল মহাকাশের দেবতা যে টাইটান নামক কোন একটি গ্রহ থেকে এসেছিল। আমাদের সৌরজগতে পৃথিবীই একমাত্র গ্রহ যেখানে প্রাণ রয়েছে। সৌরজগতে মানুষ যতদূর বিচরণ করতে পেরেছে তারমধ্যে আমরা এটিও গ্রহ বা উপগ্রহ খুঁজে পায়নি যেখানে প্রাণ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে কিন্তু আজ আমি এমন একটি উপগ্রহের নাম বলব যেখানে প্রান থাকার সম্ভাবনা থাকলেও থাকতে পারে বলে বৈজ্ঞানিকরা জানাচ্ছেন।

rohoshyosondhane
rohoshyosondhane

আজ আমরা এই সৌরমণ্ডলের দ্বিতীয় সবচেয়ে বড় উপগ্রহ টাইটানের ব্যাপারে আলোচনা করবো। ২৫ মার্চ ১৬৫৫ সালে ডাচ অ্যাস্ট্রোনোমার ক্রিস্টান হাইজিন টাইটানের আবিস্কার করেছিল। টাইটান আমাদের সৌরজগতের একমাত্র উপগ্রহ যেখানে পৃথিবীর মতো অ্যাটমোস্ফিয়ার রয়েছে। টাইটানের বায়ুমণ্ডল ধূলিকণা দ্বারা আচ্ছাদিত, তাই বহুদিন ধরে আমাদের কাছে টাইটান একটি রহস্য হয়েছিল। টাইটানের বায়ুমণ্ডল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার ওপরে অবস্থিত যা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের তুলনায় অনেক অনেক উঁচু, আর এই কারণেই বহু বছর ধরে টাইটানকে সৌরজগতের সবচেয়ে বড় উপগ্রহ মনে করা হত। কিন্তু পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে ভাইজাস মহাকাশযান, এর আকারের সঠিক পরিমাপ করে এবং এই তথ্য দেয় যে আমাদের সৌরমণ্ডলের সবচেয়ে বড় উপগ্রহ হল গ্যানিমেড আর টাইটান রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে।

rohoshyosondhane
rohoshyosondhane

আরও পড়তে ক্লিক করুন ঃ- রহস্যময় কিছু মূর্তি যারা রাতের বেলা নড়াচড়া করে || অদ্ভুত ঘটনা

টাইটানের আকারে আমাদের চাঁদ এবং মঙ্গল গ্রহের থেকে বড়। টাইটানকে নিয়ে অনেক রহস্যময় তথ্য আছে যা সর্বদা মহাকাশ বৈজ্ঞানিকদের রোমাঞ্চিত করে এসেছে। শনি গ্রহ থেকে প্রায় ১.২ মিলিয়ন কিলোমিটার দুর অবস্থিত এই উপগ্রহকে একটি জীবন্ত উপগ্রহ বলে মনে করা হয়, যেখানে প্রতিনিয়ত কোন না কোন কেমিক্যাল এবং জিওলজিক্যাল প্রক্রিয়া ঘটে চলেছে। শনি গ্রহের ছয় নাম্বার উপগ্রহ হচ্ছে টাইটান এর ডায়ামিটার ৫১৫১ কিলোমিটার। টাইটানের একদিন সমান পৃথিবীর ১৫ দিন ২২ ঘন্টা। টাইটানের ভূত্বক খুবই পাতলা, এর গভীরতা প্রায় ৩৪০০ কিলোমিটার। অনুমান করা এর ভূত্বক কঠিন বরফে আচ্ছাদিত, টাইটানে আমাদের পৃথিবীর মতোই বায়ুমণ্ডল রয়েছে যেখানে ৯৫% নাইট্রোজেন রয়েছে আর বাকি ৫% রয়েছে মিথেন, হাইড্রোজেন এবং অন্যান্য গ্যাস।

rohoshyosondhane
rohoshyosondhane

পুরো ব্রহ্মাণ্ডে পৃথিবীর পর, একমাত্র টাইটেনই এমন জায়গা যেখানে প্রচুর পরিমাণে তরল পদার্থ রয়েছে, যেভাবে পৃথিবীতেই জল তরল, কঠিন এবং গ্যাসিও অবস্থায় পাওয়া যায় ঠিকই সেইরকমই টাইটানে মিথেন তরল, কঠিন এবং গ্যাসিও অবস্থায় পাওয়া যায়, যেমন পৃথিবীর সমুদ্র এবং নদীতে  অপরিসীম জল পাওয়া যায় ঠিক তেমনই টাইটানে অপরিসীম মিথেন তরলের আকারে এখানকার সমুদ্র ও নদীতে পাওয়া যায়। এখানে মিথেন দ্বারা মেঘ সৃষ্টি হয় এবং মিথেনের বৃষ্টি হযয়, প্রায় সব কিছুই পৃথিবীর মত একটাই যা তফাত তা হল জলের জায়গায় এখানে পাওয়া যায় মিথেন।  টাইটানের ভূত্বক পৃথিবীর মতোই যদি আমরা টাইটানের পৃষ্ঠদেশে দাঁড়াই তাহলে আমরা পৃথিবীর মতোই পাথর দেখতে পাবো যা বরফ দিয়ে তৈরি আর আকাশের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাবো ধূলিকণায় আবৃত লাল রঙে একটি আকাশ, এই ধূলিকণাযুক্ত বায়ুমণ্ডলের জন্যই এখানে সূর্যের আলো খুব কম পৌছায়, মনে করা হয় টাইটানের প্রাকৃতিক গঠন অর্থাৎ এখানকার নদী, সমুদ্র এবং পাহাড়-পর্বত এই সব কিছুর উপরেই মিথেন প্রভাব বিস্তার করছে।

rohoshyosondhane
rohoshyosondhane

টাইটানে আগ্নেয়গিরিও দেখতে পাওয়া যায় কিন্তু সেই আগ্নেয়গিরি থেকে লাভার বদলে নির্গত হয় অতি ঠাণ্ডা ওয়াটার এমোনিয়া ও মিথেন। এই ভলকেন গুলিকে আইস ভলকেন বলা হয় অনুমান করা হয় টাইটানের সৃষ্টি আমাদের সৌরমণ্ডল সৃষ্টির সময়েই হয়েছিল কিন্তু টাইটানে বায়ুমণ্ডল খুবই নতুন, এটি প্রায় ১ মিলিয়ান থেকে ১ বিলিয়ন বছরের পুরোনো। টাইটানের গড় তাপমাত্রা মাইনাস ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস আর এই ঠান্ডার প্রধান কারণ হলো এখানকার বায়ুমন্ডল, যাতে প্রচুর পরিমাণে ধূলিকণা থাকার ফলে সূর্যের আলো রিফ্লেক্ট মহাকাশে ফিরে যায়।টাইটানে সবচেয়ে লম্বা নদী ২৫০ মাইল দীর্ঘ যার তুলনা পৃথিবীর নীলনদের সাথে করা হয়। প্রবাহমান এই নদী মিথেন ও ইথেন দ্বারা গঠিত যা এই উপগ্রহের দ্বিতীয় সবচেয়ে বড় ঝিল লিজিয়া ম্যারেতে গিয়ে মিশেছে। এই উপগ্রহের সবচেয়ে বড় ঝিল হল ক্রাঙ্কেন মারে যা ১ লক্ষ ৫৪ হাজার স্কয়ার মাইল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এই ঝিল আমেরিকার লেক সুপিরিয়ারের থেকে ৫ গুণ বড়। এই সমস্ত ঝিলে অনেক আইল্যান্ড দেখতে পাওয়া গেছে কিন্তু লিজিয়া ম্যারে ঝিলে যে আইল্যান্ড দেখতে পাওয়া গেছে তার গতিবিধি খুবই রহস্যময়। এই আইল্যান্ড গুলি মাঝে মাঝে অদৃশ্য হয়ে যায় আবার কিছু সময় পরে এগুলি পুনরায় ফিরে আসে।

rohoshyosondhane
rohoshyosondhane

এই রহস্যময় আইল্যান্ড গুলির নাম দেওয়া হয়েছে ম্যাজিক আইল্যান্ড। এই সমস্ত রহস্যময় ঘটনার পেছনে কি ব্যাখ্যা আছে তা জানার জন্য বৈজ্ঞানিকরা আজও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই সমস্ত রহস্যভেদ করার জন্যই টাইটানে বহুবার মহাকাশযান পাঠানো হয়েছে। টাইটানে প্রথম মহাকাশযান পায়োনির ১১ পাঠানো হয়েছিল ১৯৭৩ সালে, যা এই তথ্য সংগ্রহ করেছিল যে এটা খুবই ঠাণ্ডা একটি উপগ্রহ যেখানে প্রান থাকার উপযুক্ত পরিবেশ নেই। পায়োনির ইলেভেন টাইটানের কিছু ছবিও পৃথিবীতে পাঠিয়ে ছিল। এরপর ১৯৮০ এবং ৮১তে টাইটানে ভয়েজার-ওয়ান এবং ভয়েজার টু নামক দুটি মহাকাশযান পাঠান হয়েছিল। ভয়েজার-ওয়ানকে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল যাতে এটি টাইটানকে প্রদক্ষিণ করার সময় টাইটানের বায়ুমণ্ডল এবং আকারের সঠিক পরিমাপ করতে পারে। কিন্তু টাইটান সর্বদাই আমাদের জন্য রহস্যময় উপগ্রহ হয়ে রয়ে গিয়েছে এই রহস্য উদঘাটন করার জন্য ক্যাসিনি হায়জেন্স নামক আরও একটি মহাকাশযানকে টাইটানে পাঠান হয়। ১লা জুলাই ২০০৪ সালে টাইটানের বায়ুমন্ডলে প্রবেশ করে ক্যাসিনি হায়জেন্স। এটি ছিল নাসা এবং ইউরোপিয়ান পেসএজেন্সির যৌথ মিশন।

rohoshyosondhane
rohoshyosondhane

২৬ অক্টোবর ২০০৪ সালে ক্যাসিনি টাইটানের হাই রেজুলেশন ছবি পৃথিবীতে পাঠায়। ক্যাসিনি ২১ জুন ২০১০ এ টাইটানের সবচেয়ে কাছে পৌছে গিয়েছিল এই দূরত্ব ছিল মাত্র ৮৮০ কিলোমিটার। সেই সময় এটি টাইটানের উত্তরিভাগ সমুদ্র এবং ঝিলে জমে থাকা অপরিসীম তরল পর্দাথের খোঁজ পায়। ১৪ জানুয়ারি ২০০৫ টাইটানের ইতিহাসে একটি মহান দিন কারন হাইজেন্স প্রোব সেইদিন টাইটানের ভূ-পৃষ্ঠে অবতরণ করেছিল । এই টাইটানই হল আমাদের পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থিত জায়গা যেখানে মানুষের তৈরি কোন যান অবতরণ করা হয়েছিল। হাইজেন্স প্রোব টাইটানের একটি উজ্জ্বল জায়গায় অবতরণ করা হয়েছিল যে জায়গাটির নাম দেওয়া হয় অ্যাডেরি। তবে টাইটানে এলিয়েন লাইফ থাকতে পারে তা আজও আমাদের বৈজ্ঞানিকরা মনে করে, পরীক্ষায় জানা গেছে টাইটানে সেইরকম অর্গানিক মেটেরিয়াল মজুত আছে যার থেকে পৃথিবীতে জীবনের সৃষ্টি হয়েছিল, আর হতে পারে ভবিষ্যতে এখানে জীবনের সৃষ্টি হতে পারে।

rohoshyosondhane
rohoshyosondhane

বৈজ্ঞানিকরা মনে করেন টাইটানে মিথেনের ঝিল বা সমুদ্রেও থাকতে পারে জীবন যেমন পৃথিবীর সমুদ্রে দেখতে পাওয়া যায়। ধারনা করা হচ্ছে সেই সমস্ত প্রাণীরা হয়তো শ্বাস নেওয়ার জন্যে অক্সিজেনের বদলে H2 ব্যাবহার করে আর তারা গ্লুকোজে জায়গায় অ্যাসিটালিনের সাহায্যে ম্যাটাবলাইজ করে। হতে পারে তারা কার্বন-ডাই-অক্সাইডের বদলে মিথেন বাতাসে ছাড়ে। আমরা পৃথিবীতে পানীয় হিসাবে জলকে ব্যবহার করি টাইটানে হয়তো মিথেন বা ইথেনের ব্যবহার করা হয় কিন্তু এত সম্ভাবনা থাকা সত্বেও টাইটানে মানব জীবন অসম্ভব, এর সবচেয়ে বড় উদাহরন হলো সূর্য।

rohoshyosondhane
rohoshyosondhane

যা অনেক দূরে অবস্থিত, আর এখানকার পরিবেশ খুবই ঠাণ্ডা এবং জমাট অবস্থায় রয়েছে, এইখানে ওয়াটার মলিকিউল নেই বললেই চলে আর কার্বন-ডাই-অক্সাইড খুবই কম পরিমাণে আছে। কম অক্সিজেন এবং অল্প আলো এখানে জীবন ধারনের জন্য খুবই কঠিন কিন্তু আজ থেকে ৫ বিলিয়ান বছর পর যখন আমাদের সূর্য রেড জায়েন্ট হয়ে যাবে তখন টাইটানের বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা অনেকটাই বেড়ে যাবে তখন জমে থাকা জল তরলে পরিণত হবে এবং কঠিন গ্যাসে পরিণত হবে, এর বায়ুমণ্ডলের উপরের ধুলিকনার আস্তরণ পাতলা হতে থাকবে তখন হয়ত টাইটান আমাদের বসবাসের জন্য সৌরমণ্ডলের সবচেয়ে উপযোগী জায়গা হতে পারে। সম্ভাবনা তো অনেক রয়েছে কিন্তু আমাদের এখনো চেষ্টা করে যেতে হবে।

আজ এই পর্যন্তই যদি ভাল লাগে তাহলে ভিডিওটিকে লাইক ও শেয়ার করুন এবং আরো মানুষের জানার সুযোগ করে দিন আর এইরকমই রহস্যময় ভিডিও দেখার জন্য আমাদের চ্যানেলটিকে অবশ্যই subscribe করুন। দেখা হবে পরের ভিডিওতে, ভালো থাকবেন, ধন্যবাদ।

সুমন্ত ……………

rohoshyosondhane
rohoshyosondhane

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here