চীনের রহস্যময় টেরাকোটা আর্মির অজানা ইতিহাস

0
125

ইতিহাস এমন একটি সাগার যার গভীরতা অনুমান করা প্রায় অসম্ভব। যদি চীনের বলি তাহলে এই দেশের ইতিহাসও খুবই পুরাতন। চীনের ইতিহাসে এত সভ্যতা এসেছিল এবং এত রাজা এসছিল যে তাদের ব্যাপারে সম্পূর্ণ তথ্য উথঘাটন করা, একটি পাহাড়ে চড়ার সমান। এই রাজারা তাদের সময় কালে, নিজেদেরকে ইতিহাসের পাতায় অমর বানানোর জন্য অনেক কিছু করে গেছে। তাদের মধ্যেই একটি হলো চীনের মহাপ্রাচীর, এবং আর একটি হল টেরাকোটা আর্মি যুক্ত সমাধিস্থল। টেরাকোটা সেনার গুপ্ত মূর্তিগুলি চীনের রাজা কিং সি হুয়াংয়ের কবরের সাথে চাপা দিয়ে দেয়া হয়েছিল, কিন্তু এমনটি কেন করা হয়েছিল সেটি আজ এই ভিডিওর মাধ্যমে আমরা জানবার চেষ্টা করব। তো চলুন ইতিহাসের পাতা উলটে জেনে নেয়া যাক চীনের প্রথম সম্রাট কিং সি হুয়াংয়ের সমাধিস্থলের ব্যাপারে।

rohoshyosondhane
rohoshyosondhane

এই ঘটনাটি প্রায় আড়াইশো ঈসাপূর্বের, যখন চীনের সাংশি অঞ্চলে ১৩ বছর বয়সি এক যুবক রাজা ইং ঝিং নিজের সমাধিস্থল বানানো হুকুম জারী করে। ৩৮ বছর বয়সে কিং ঝিং চিনের যুদ্ধরত সমস্ত রাজ্য গুলোকে একত্রিত করতে সফল হয় এবং চীনের প্রথম সম্রাট কিং সি হুয়াং হয়। সম্রাট কিং সি হুয়াং ২২১ থেকে ২৬০ ঈসাপূর্ব পর্যন্ত চীনের ওপর শাসন চালিয়েছিল। চীনের মহা প্রাচীরের নির্মাণও হুয়াংই করিয়েছিলেন। আস্তে আস্তে সম্রাটের শক্তি এবং সাম্রাজ্য বৃদ্ধি পেতে থাকে, তার আধিপত্য চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সম্রাট চাইছিলে তার মৃত্যুর মানুষ যেন তাকে ভুলে না যায় আর তাই তিনি আদেশ দেন যে তার জন্য একটি বিশাল সমাধিস্থল নির্মাণ করা হোক। এই সমাধিস্থল নির্মাণ করতে হবে মাটির নিচে এবং সেখানে তার পুরো সেনাবাহিনীর মাটির পুতুল থাকতে হবে।

rohoshyosondhane
rohoshyosondhane

এর আগে এই পৃথিবীতে এত বড় সমাধিস্থল আর কোথাও বাড়ানো হয়নি। এরপর রাজার আদেশে আনুযাই কাজ শুরু হয়, এই সমাধি জন্য সিয়াং শহরের উত্তরে পাহাড়ি অঞ্চলটিকে বেছে নেয়া হয়। যেখানে মাটির নিচে খোদাই করে রাজার সমাধি স্থল নির্মাণ করা হয় এবং তার কবরের সাথে তার বীর যোদ্ধাদের এবং তাদের ঘোড়ার মাটির পুতুল নির্মাণ করা হয়। এই সমস্ত জিনিস নির্মাণের পর কবরটিকে মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। এর পর প্রায় ২২০০ বছর ধরে এই সমাধিস্থল মানুষের চোখের আড়ালেই মাটির নিচে চাপা পড়ে ছিল। ১৯৭৪ সালে একজন কৃষক সেই জায়গায় কুয়া বানানোর জন্য খনন করছিল, তখন তার নজর মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা এই সমাধিস্থলের উপর পড়ে। আর তখনই আবিষ্কার হয় চীনের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিল্প কার্য।

rohoshyosondhane
rohoshyosondhane

এরপর প্রায় ১০ বছর ধরে পুরাতত্ত্ব বিভাগের লোকেরা এই স্থান এবং এর আশেপাশের স্থান গুলিতে খনন কার্য চালায়। এই খনন কার্য চালাবার পর তারা প্রায় আট হাজার চীনা যোদ্ধার মাটির মূর্তি উদ্ধার করে। যেগুলিকে একদম নিখুত ভাবে বানানো হয়েছিল। এই খননকার্য যখন আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন জানা যায় যে সম্রাটের মৃত্যুর পর তার দেহটিকেও এই কবরের মধ্যেই রাখা হয়েছিল। হুয়াং-এর ৩৮ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই সমাধিস্থলে, সম্রাটের জীবন যাপনের একটি চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। টেরাকোটা আর্মির নির্মাণ, চীনের প্রথম সম্রাটের সমাধি স্থলকে সুরক্ষা প্রদান করার জন্য করা হয়েছিল। এই মুর্তি গুলি সন ৪৭৬ থেকে ২২১ ঈসাপূর্ব সময়কার একত্রিত চীন সেনাদের প্রতি রুপ।

rohoshyosondhane
rohoshyosondhane

আরও পড়তে ক্লিক করুন ঃ- ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী ১০টি যুদ্ধ বিমান

এই মুর্তি গুলিকে আলাদা আলাদা ভাগে বানানো হয়েছিল, তারপর সেই গুলিকে জোড়া লাগিয়ে তার উপর রং করা হয়। অদ্ভুত এই সমাধিস্থলটির নির্মাণকাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে অনেক মতবিরোধ রয়েছে। বেশিরভাগ ঐতিহাসিকরা মনে করেন, সমাধিস্থলটি বানাতে প্রায় ৪০ বছর সময় নিয়ে লেগেছে আবার অনেকে মনে করেন এই সমাধিস্থল বানাতে প্রায় ১০ বছর সময় লেগেছে, তাদের কথা অনুযায়ী যখন ২২১ ঈসাপূর্বে রাজা কিং সি হুয়াং বাকি সমস্ত রাজ্যকে পরাস্ত করে একটি সংযুক্ত চীনের নির্মাণ করে, সেই সময় তিনি এর নির্মাণকার্য শুরু করেন এবং ২০৯ ঈসাপূর্বে এই কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়।

rohoshyosondhane
rohoshyosondhane

এই সমাধিস্থলে পাওয়া পুতুল গুলির পরীক্ষা করে জানা যায়, অতীতে টেরাকোটা আর্মির এই মুর্তি গুলি অনেক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল, যেমন নদীর বন্যা এবং ভূমিকম্প, পরীক্ষায় পাওয়া পুতুলের ওপর ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন এর প্রমাণ দেয়। বিশেষজ্ঞদের মত অনুসারে সমাধিস্থল নির্মাণের সময় এর চারদিকে সাড়ে তিন মিটারের মোটা প্রাচীর দেয়া হয়েছিল কিন্তু বন্যার কারণে এটি মাত্র ১ দশমিক ৭ মিটারই রয়ে যায়, যার কারণে এই পুতুলগুলির অনেক ক্ষয়ক্ষতির হয়। ঐতিহাসিকদের মত অনুযায়ী পশ্চিমের রাজা চু সিয়াং ইউ এই সমাধিস্থলকে ধ্বংস করে দেওয়ারও চেষ্টা করা হয়েছিল। এর প্রমাণ খোদাই করার সময় পাওয়ার, যোদ্ধাদের হাতিয়ার থেকে পাওয়া যায় করা হয়। এর পেছনে সমাধিস্থল থাকা তামার তলোয়ার এবং অন্যান্য হাতিয়ার চুরি বা লুট করার উদ্দেশ্য ছিল মনে করা হচ্ছে। খননকারীরা এই সমাধি স্থল থেকে জ্বলন্ত মাটির অবশেষ এবং অনেক পোড়া কাঠের টুকরো পেয়েছিল।

rohoshyosondhane
rohoshyosondhane

এর থেকে বোঝা যায় টেরাকোটা আর্মির এই পুতুল গুলোকে নষ্ট করে দেয়ার জন্য আগুনের ব্যাবহার হয়েছিল কিন্তু এই কাজগুলিকে করতে পারে, এর সম্ভাব্য কারণ প্রাচীন চীনের ইতিহাস থেকে পাওয়া যেতে পারে, যার অনুযায়ী কিং সি হুয়াং,  চু রাজ্যকে ধ্বংস করে দিয়েছিল এবং সিয়াং-এর পরিবারকেও হত্যা করেছিল আর এটাই বড় কারণ ছিল যে সিয়াং তার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য  কিং সি হুয়াং-এর সমাধিস্থলকে নষ্ট করে দিতে চেয়েছিল। আবিষ্কার হওয়ার পর পর এই সমাধিস্থলটিকে চীনের সরকারি সম্পত্তি বলে ঘোষণা করে দেয়া হয় এবং ২০০৫ সালে চীনের সরকার এটিকে নিজের অধীনে করেনেয়। এটিকে দেখাশোনার সমস্ত দায়িত্ব চীনের পুরাতত্ত্ব বিভাগের উপর দিয়ে দেওয়া হয়। এই প্রাচীন সমাধিস্থলটিকে ২০১৭ সালে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট বলে ঘোষণা করে। এই সমাধিস্থলের দেখাশোনা করার জন্য চীনে কিং হুয়াং নামের একটি বিভাগ বানানো হয়। ২০০৯ সালে এই সমাধিস্থলকে একটি মিউজিয়াম রুপে সারা বিশ্বের সামনে খুলে দেওয়া হয়। এখানে টেরাকোটা আর্মির পুতুল গুলির অবশেষ জনসমক্ষে প্রদর্শন করা হয়, চীনের প্রাচীন ইতিহাসকে তুলে ধরা এই সমাধিস্থল সারা বিশ্বের মানুষের কাছে একটি ঐতিহাসিক পর্যটন স্থল হিসেবে আজ পরিচিত। প্রতিবছর হাজারো পর্যটক এখানে, এই টেরাকোটা আর্মিদের দেখতে এবং এর পেছনে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস জানতে এখানে উপস্থিত হয়।

ধন্যবাদ ………

সুমন্ত ……

rohoshyosondhane
rohoshyosondhane

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here